Find Us OIn Facebook

 

প্রাচীন বাঙালির হিন্দু ও বৌদ্ধ সমাজে পদবির পরিচয় না পাওয়া গেলেও প্রাচীন কালের বাঙালি মুসলমানের পদবির ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার যেসব বৌদ্ধ কবির নাম ‘চর্যাপদ’ নামক প্রাচীন গ্রন্থে রয়েছে, তাতে কাহ্নপা, লুইপা, কুক্কুরিপা প্রমুখের নাম পাওয়া যায়। এতে বৌদ্ধদের পদবি স্পষ্ট নয়। ‘পা’ শব্দটি পদবি বলে মনে হয় না, এটা পদকর্তার চিহ্ন। যেমন ‘কবি’ শামসুর রাহমান, ‘কবি’ নির্মলেন্দু গুণ। প্রাচীন বাঙালি পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের নামেও কোনো পদবি নেই। হিন্দু সমাজের প্রাচীন রাজা লক্ষ্মণ সেন, বল্লাল সেন ইত্যাদিতে ‘সেন’ পদবি পাওয়া যায়, তবে তাঁরা বাঙালি ছিলেন না।

কিন্তু প্রাচীন আমলের বাঙালি মুসলমানের নামের সঙ্গে পদবি ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষযোগ্য। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায়ই আরবরা বাংলায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে উপমহাদেশে এসেছিলেন। তাঁদের একটি জামাত উত্তর বাংলায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মসজিদ স্থাপন করে। [বিস্তারিত দেখুন ব্রিটিশ গবেষক টিম স্টিলের বিবরণী]।

বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যাঁরা ‘শেখ’ পদবি ব্যবহার করেন, তাঁদের ঐতিহ্য এ দেশে এই আরব মুসলমানদের আগমনের সঙ্গে জড়িত। আরবরা ‘শেখ’ বা তার থেকে ‘শায়খ’ পদবিধারী ছিলেন। বাঙালি যাঁরা সে সময় মুসলমান হয়েছিলেন, তাঁরা সরাসরি ‘শেখ’ পদবি ধারণ করেন। প্রাথমিকভাবে আরবের অনেক শেখ পরিবারও আরব থেকে এসে বাংলাদেশে বসবাস করেছিল। যেমন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার। ‘শেখ’ পদবি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিয়ের সূত্রেও বিস্তার লাভ করে।

মধ্যযুগের কাব্যগুলোতে মুসলমানদের পরিচয় সূত্রে ‘শেখ’ পদবির সঙ্গে ‘সৈয়দ’ পদবিও উল্লিখিত আছে। সৈয়দরা এসেছিলেন মধ্য এশিয়া এবং পারস্য  অঞ্চল থেকে। তাঁদের কাছে যাঁরা মুসলিম হয়েছিলেন, তাঁরা ‘সৈয়দ’ পদবি লাভ করেন। এ ক্ষেত্রেও কিছু কিছু ‘সৈয়দ’ বংশ-পদবি হিসেবে এসেছে বিয়ের সূত্রে। বাগেরহাটের সৈয়দ-মহল্লার সবাই সৈয়দ পদবিধারী। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ’ তাঁর বংশ-পদবি নামের শেষে ব্যবহার করতেন।

প্রাচীন-মধ্যযুগের সন্ধিক্ষণে প্রথম যে মুসলিম কবির কথা আমরা সাহিত্যের ইতিহাসে পাই, তিনি হলেন ‘শাহ’ মোহাম্মদ সগীর। এ সময়ের আরো কবি, দৌলত উজির বাহরাম ‘খান’ এবং পদকর্তা ‘শেখ’ ফয়জুল্লাহ, ‘শেখ’ কবীর, ‘সৈয়দ’ মর্তুজা, ‘সৈয়দ’ সুলতান প্রমুখ। এখানে আমরা বেশ কয়েকটি অভিজাত বংশ-পদবির পরিচয় পাই। ‘শাহ’ (বাদশাহী বংশ পরিবার), ‘শেখ’ (আরব থেকে আগত), ‘সৈয়দ’ (পারস্য থেকে আগত বংশধারা) ইত্যাদি। ‘খান’ পদবির লোকেরা এসেছিল বৃহত্তর আফগানিস্তান-পখতুনিস্তান থেকে, যারা মূলত ‘পাঠান’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে ‘পাঠান’ বংশ পদবিও আছে। জেনারেল এরশাদের জামানায় নেত্রকোনা থেকে একজন সংসদ সদস্য ছিলেন, নূরুল আমিন খান পাঠান। এখানে ‘খান’ ও ‘পাঠান’ দুটো পদবিই একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে।

পদবির লিঙ্গান্তরও হয়েছে বাঙালি সমাজে। ‘সৈয়দ’ বংশের মেয়েরা লেখেন ‘সৈয়দা’। সৈয়দা হাফসা বেগম (শিশু একাডেমির কর্মকর্তা ছিলেন)। খান পরিবারের মেয়েরা হয়েছেন ‘খানম’। কবি খালেদা খানম। তবে বাংলা ভাষার পণ্ডিতরা মনে করেন, ‘খানম’ শব্দটি এসেছে তুর্কি ভাষা থেকে। ‘হানুম>খানুম>খানম’। [বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, সম্পাদক : প্রফেসর আহমদ শরীফ, ঢাকা ১৯৯২, পৃষ্ঠা ১৫৮]।

খানরা আবার যাঁরা ব্রিটিশের তাঁবেদার ছিলেন, তাঁরা উপাধি পেয়েছিলেন ‘খানবাহাদুর’। হিন্দুদের মধ্যেও এক শ্রেণির ব্রিটিশের দালাল ছিল, যাদের খেতাব দেওয়া হয়েছিল ‘রায় বাহাদুর’। ‘খান’ পদবি আরো বিস্তৃত হয় যখন পার্লামেন্ট সদস্যের পদবি ছিল ‘খান মজলিশ’। বংশ ধারায় পরবর্তীকালে সংসদ সদস্য না হলেও পরিবার-পরিজনের সবার নামের সঙ্গে আছে ‘খান মজলিশ’ পদবি। দাউদ খান মজলিশ, (ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ পাঠক), আনায়ারুল হক খান মজলিশ (ব্যানবেইসের সাবেক পরিচালক)।

‘চৌধুরী’রা ছিলেন ছোট জমিদার। ‘চৌথহারী’ যার অর্থ। এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব আদায়কারী, বাংলার রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি পদ, সেখান থেকেই ‘চৌধুরী’। [লোকেশ্বর বসু : আমাদের পদবির ইতিহাস, আনন্দ, কলকাতা ১৯৯১]। মধ্যযুগে গ্রামের মোড়লকেও বলা হতো চৌধুরী। ‘গ্রাম মুলুকের হলো সে চৌধুরী’। [চৈতন্যচরিতামৃত]।

তাই হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েই রয়েছে চৌধুরী পদবি, প্রফেসর মুনীর চৌধুরী, রাজনীতিক মতিয়া চৌধুরী, ব্রিটিশের খয়ের খাঁ বুদ্ধিজীবী নীরদ চৌধুরী, শক্তিপদ চৌধুরী প্রমুখ। ‘চৌধুরী’ পদবিরও লিঙ্গান্তর হয়েছে ‘চৌধুরানী’। বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেবী চৌধুরানী’।

‘কাজী’রা বিচারকই ছিলেন। বংশধারায় পরবর্তীরা বিচারক না হলেও ‘কাজী’ পদবি ব্যবহার করেছেন। বাংলার বিদ্রোহী কবি নজরুল ছিলেন ‘কাজী’ পদবিধারী। কথাসাহিত্যিক ও সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমানও বিশিষ্ট বাঙালি নাগরিক।

ধর্মযুদ্ধে শহীদ হওয়ার পরও ‘শহীদ’ কোনো পদবি হয়নি, কিন্তু যুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবিত ফিরে আসায় উপাধি পেয়েছেন ‘গাজী’। পরবর্তীকালে যুদ্ধে অংশ না নিয়েই বংশধারার সবারই পদবি হয়েছে ‘গাজী’। গাজী সাহাবুদ্দিন (সচিত্র সন্ধানী), গাজী আরশাদ (জাতীয় পার্টির নেতা), গাজী নাজমা প্রমুখ।

‘ঠাকুর’ পদবিকে জনপ্রিয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই। ইংরেজরা সর্বত্রই বিকৃত করতে ভালোবাসত, তাই রবীন্দ্রনাথ হয়েছিলেন ‘ট্যাগোর’, ‘ঠাকুর’ নন। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘ঠাকুর’ শব্দের মূল হচ্ছে সংস্কৃত ‘ঠাক্কুর’। [বঙ্গীয় শব্দকোষ, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য আকাদেমী, কলকাতা ১৯৭৮, পৃষ্ঠা ৯৮৭-৯৮৮]। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু নন, ব্রাহ্ম ছিলেন। হিন্দুদের মধ্যে ‘ঠাকুর’ পদবির ব্যবহার বিশেষ দেখা যায় না, তবে মুসলমানদের মধ্যে ‘ঠাকুর’ পদবি আছে জোরেশোরে। সাবেক বৃহত্তর বাংলার অংশ এবং বর্তমান মিয়ানমারের রোসাং রাজসভার মন্ত্রী ছিলেন কোরেশী মাগন ঠাকুর। অর্থাৎ তিনি আরবের কুরাইশ বংশোদ্ভূত ছিলেন, আবার ঠাকুরও ছিলেন। ড. আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘ঠাকুর’ তুর্কিজাত শব্দ। [সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, ১৯৯২, পৃষ্ঠা ২৭২]। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর। সচিব ছিলেন আবদুল কাইউম ঠাকুর।

এক অর্থে সব মুসলমানের পদবিই এক সময় ছিল মিয়া বা মিঞা। যাঁদের কোনো পদবি ছিল না, সেসব মুসলমান ‘মিয়া’ পদবি ব্যবহার করতেন। আবার সাধারণ মুসলমান কালু মিয়া, ভোলা মিয়া, এখন সব মিয়া আবার নামের অংশ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। সম্বোধনেও ‘মিয়া’ শব্দ ব্যবহার হয়, ‘কী মিয়া, কেমন আছেন’। বাঙালি হিন্দুর ‘মহাশয়’ শব্দের বিপরীতে বাঙালি মুসলমানে একসময় ‘মিঞা’ শব্দের ব্যবহার হয়েছে। মিয়া বা মিঞা  ফারসি জাত শব্দ।

মীর, মির্জা—একই পরিবারের দুই পদবি। মূল ‘আমির’ থেকে ‘মির’ বা ‘মীর’  শব্দ এসেছে। বাঙালি মুসলমানের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন এই পদবির শ্রেষ্ঠ সন্তান। মীর থেকে তার সন্তান হয়েছে মীরজাদা, যেমন—নবাবজাদা, সাহেবজাদা। এই মীরজাদা থেকেই হয়েছে মীরজা বা মির্জা। মির্জা গোলাম হাফিজ (সাবেক আইনমন্ত্রী), মির্জা আব্বাস  (বিএনপি নেতা), মির্জা আযম (আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য)। পঞ্চগড়ের মির্জাপুর গ্রামের সবাই মির্জা।

‘মোল্লা’ ও ‘মুনশী’, মিয়া পদবির মতোই বাঙালি মুসলিম সমাজে জনপ্রিয় ছিল। ‘মোল্লা’ আরবি শব্দ, তবে তুর্কি ভাষায়ও ‘মোল্লা’ শব্দ আছে, যার অর্থ ‘পরিপূর্ণ জ্ঞানবিশিষ্ট মহাপণ্ডিত ব্যক্তি’। [ব্যাবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, ১৯৯২, পৃষ্ঠা ৯২৫]।

তবে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, মোল্লা হচ্ছেন ‘মুসলমান পুরোহিত’। [বঙ্গীয় শব্দকোষ, সাহিত্য আকাদেমী, কলকাতা, ১৯৭৮]।

একসময় মসজিদের ইমামকেও মোল্লা বলা হতো, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো সে কারণেই ‘মুসলমান পুরোহিত’ কথাটি বলেছেন। মোল্লা যেহেতু জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের বলা হতো, তাই একদল বুদ্ধিজীবী কটূক্তি করতে ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’ প্রবাদের সৃষ্টি করেন এবং পদবিকে হেয় ও কৌতুকের পাত্র করার চেষ্টা করেন। ভাষা ও ব্যাকরণ বইয়েও এই প্রবাদ লিপিবদ্ধ করা হয়। বাদশাহ আকবরের সভাসদ ছিলেন মোল্লা দোপায়েজা। বাংলাদেশের তরুণ সাংবাদিক ছিলেন মোল্লাহ আমজাদ হোসেন।

মসজিদের ইমামকে ‘মুনশী’ও বলা হতো। শব্দটি দক্ষতা ও নৈপুণ্য অর্থেও প্রচলিত ছিল। কাজের মুনশিয়ানা বলতে পটুতাকেই বোঝায়। কিন্তু শব্দটি আরবি হলেও ব্রিটিশ আমলে কেরানি পেশাকে ‘মুনশি’ বলা হতো। বাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ে রয়েছে ‘মুনশি’ পদবি। ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গের যুব কংগ্রেসের নেতা প্রিয় রঞ্জন দাশ মুনশি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট লেখক ছিলেন মুনশি মেহেরুল্লাহ।

Post a Comment

Previous Post Next Post